সাইবার অপরাধ তদন্তে আসছে নতুন ইউনিট

0

রাজধানীর ইডেন কলেজের ছাত্রী ফারজানা (ছদ্মনাম) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তানভীর (ছদ্মনাম) পাঁচ বছর ধরে প্রেম করেছেন। কিন্তু পরিবারের চাপে ফারজানা বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা শাহীনকে (ছদ্মনাম) বিয়ে করতে বাধ্য হন। হঠাৎ একদিন ফারজানাকে ফোন করে স্বামী শাহীন জানান, ‘আমার ফেসবুক ইনবক্স চেক কর। তোমার প্রেমিক সেখানে কিছু ছবি পাঠিয়েছে। যেগুলো আমার পক্ষে আর দ্বিতীয়বার দেখা সম্ভব নয়।’ এরপরই ফারজানার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। এর রেশ কাটতে না কাটতেই শ্বশুরবাড়ি থেকে আসতে থাকে একের পর এক ফোন। কারণ, তানভীর শুধু ফারজানার স্বামীর ইনবক্সে আপত্তিকর অশ্লীল ছবিগুলো পাঠায়নি। ভুয়া ফেসবুক আইডি (একজন মেয়ের নামে) খুলে সে ফারজানার ভাসুর ও ননদসহ অন্য আত্মীয়দের ফেসবুক অ্যাকাউন্টেও সেগুলো পাঠায়। সেগুলো ছিল তাদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি।

এ রকম একটি বা দুটি ঘটনা নয়, এ ধরনের ঘটনা ঘটছে অহরহ। ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে বিভিন্ন অপরাধ। পর্নোগ্রাফি, ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং, মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে টাকা উত্তোলন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার প্রভৃতি ‘সাইবার অপরাধ’ আশঙ্কাজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। এ সাইবার অপরাধ তদন্তে পুলিশের বিশেষ ইউনিট ‘সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো’ গঠন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই শেষে ইউনিট গঠনের প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন শেষে শিগগির ইউনিটটি সারা দেশে কাজ শুরু করবে। পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, সিআইডির অধীন এ ইউনিটটির নেতৃত্বে থাকবেন একজন ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তা। এর মোট জনবল হবে ৫০৫ জন।

বিশিষ্ট প্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার বলেন, দেশে সাইবার অপরাধ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এ বিষয়ে অনেক আগেই সরকারের নজর দেয়া উচিত ছিল। তবে আশার কথা সরকার সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো গঠন করতে যাচ্ছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন পাসেরও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এগুলো কার্যকর হলে সাইবার অপরাধ কমে আসবে।

পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের উপকমিশনার (ডিসি) আলীমুজ্জামান বলেন, সাইবার অপরাধ নিয়ে ডিএমপিতে তার নেতৃত্বে একটি টিম কাজ করছে। এটি ডিএমপিতে বিশেষায়িত সাইবার ইউনিট। এর জনবল ৬৭ জন। এর মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তা (পরিদর্শক ও এসআই পদমর্যাদার) ১৬ জন। তাদের তদারকির জন্য রয়েছেন চারজন সহকারী কমিশনার (এসি), দুজন অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) এবং একজন ডিসি। তিনি আরও বলেন, তাদের কাছে মাসে গড়ে ৭০-৮০টি সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত অভিযোগ আসে। এ ছাড়া ডিএমপির ৪৯টি থানায় প্রতিনিয়ত এ সংক্রান্ত মামলা হচ্ছে। ১৬ জন তদন্ত কর্মকর্তার পক্ষে সব অভিযোগের তদন্ত করা সম্ভব নয়। তাই এসব অপরাধ দমনে বড় ধরনের ইউনিট গড়ে তোলা জরুরি। ডিএমপির সাইবার ইউনিটের জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়াতে সংশ্লিষ্ট কমিশনারের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে বলেও জানান আলীমুজ্জামান।

পুলিশ সদর দফতরের সংশ্লিষ্ট এআইজি ফারুক আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, সাইবার ইনভেস্টিগেশন ব্যুরোর মূল কাজ হবে সাইবার অপরাধ দমন করা। আগামী ৩ থেকে ৪ মাসের মধ্যে এই নতুন ইউনিটের কাজ শুরু হবে। ফেসবুক, টুইটারসহ নানান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তখন অপরাধ করার সাহস অনেকে পাবে না। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পুলিশের নতুন ইউনিট সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো কাজ শুরু করলে সাইবার অপরাধ অনেকাংশে কমে যাবে। জানা গেছে, দেশে সাইবার অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেশকিছু সদস্য বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি টিমও এ নিয়ে কাজ করছে। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো ইউনিট গঠন করা হয়নি। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বর্তমানে দেশে পৌনে ৭ কোটি ইন্টারনেট গ্রাহকের মধ্যে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা আড়াই কোটি। পৃথিবীর যেসব শহরে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেশি, সেসব শহরের মধ্যে ঢাকার স্থান দ্বিতীয়। প্রথম স্থানে রয়েছে ব্যাংকক।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব কামরুল আহসান তালুকদার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো গঠনের বিষয়ে অবহিত করা হয়। এর প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে পুলিশ সদর দফতর জানায়, অপরাধীরা বিভিন্ন ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সাইবার অপরাধ করছে। এ ধরনের অপরাধ দিন দিন বাড়ছে। পুলিশ সদর দফতরের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ১৩ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের (পুলিশ) সভাপতিত্বে সভা হয়। ওই সভায় ৫০৫টি পদ সৃজন ও ৮৫টি যানবাহনের বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো যেসব যানবাহন পাবে সেগুলো হল- ১৭টি জিপ, ২০টি পিকআপ, চারটি মাইক্রোবাস, দুটি বড় বাস, দুটি মিনি বাস এবং ৪০টি মোটরসাইকেল। এরই মধ্যে সিআইডি কার্যালয়ে কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেটিভের অর্থায়নে ২৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সাইবার ইনভেস্টিগেশন সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে। এটিকে সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ব্যুরোর প্রধান কার্যালয় করা হবে। নতুন ইউনিটে একজন ডিআইজি ছাড়াও তিনজন অতিরিক্ত ডিআইজি, পাঁচজন এসপি (পুলিশ সুপার), আটজন অতিরিক্ত এসপি, ৩৮ জন এএসপি, ৮৫ জন পরিদর্শক, ১৮০ জন এসআই, ৬০ জন এএসআই এবং ১০০ জন কনস্টেবল থাকবে।

সূত্র জানায়, সাইবার অপরাধকে বিচারের আওতায় আনতে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সরকার। প্রথম বছরে ট্রাইব্যুনালে তিনটি মামলা ছিল। ২০১৪ সালে ৩২টি, ২০১৫ সালে ১৫২টি, ২০১৬ সালে ২৩৩টি মামলা ট্রাইব্যুনালে আসে। ২০১৭ সালে এ সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। সূত্র আরও জানায়, এ অপরাধের শিকার মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষ মামলার আশ্রয় নেয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা মামলা করতে অনীহা প্রকাশ করেন। এক জরিপে বলা হয়, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নারীর মধ্যে ৭৭ শতাংশই ফেসবুককেন্দ্রিক সাইবার অপরাধের শিকার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here