
সোমবার (৫ জানুয়ারি) চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসিব আজিজ এই বরখাস্তের আদেশ দেন।
বরখাস্ত হওয়া পুলিশ সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ আল-আমিন সরকার ও মোহাম্মদ আমির হোসেন, সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) সাইফুল আলম, মো. জিয়াউর রহমান, সাদ্দাম হোসেন, এনামুল হক এবং কনস্টেবল মো. রাশেদুল হাসান ভূঞা ও উম্মে হাবিবা স্বপ্না।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ ডিসেম্বর দিনগত রাত আনুমানিক ১টা ২০ মিনিটে দেশ ট্রাভেলসের একটি এসি বাসে তল্লাশিকালে উদ্ধার হওয়া ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ পিস ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য আত্মসাৎ, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান এবং বৈধ আদেশ অমান্য করার অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আট পুলিশ সদস্যকে সোমবার রাতেই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়, পিআরবি বিধি-৮৮০ অনুযায়ী অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের পুলিশ বিভাগের সরকারি চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
বরখাস্তকালীন সময়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের আরআই (আরআই), দামপাড়া পুলিশ লাইনস, সিএমপি চট্টগ্রামে রিপোর্ট করে সার্বক্ষণিক হাজির থাকতে ও নিয়মিত রোলকল দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া সাময়িক বরখাস্তকালীন সময়ে তারা বিএসআর পার্ট-১ এর বিধি-৭১ অনুযায়ী খোরপোষ ভাতাসহ প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা পাবেন। আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে।
সিএমপি দক্ষিণ বিভাগের ২২ নম্বর আদেশের অনুলিপি ও সাময়িক বরখাস্তের আদেশ সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে পুলিশ বিভাগ অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ অনুসন্ধানে সাবেক সিএমপির দক্ষিণ বিভাগের বাকলিয়া থানা এবং পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা থেকে প্রেরিত প্রতিবেদনে মাদকদ্রব্য উদ্ধার ও আত্মসাতের ঘটনার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়।
অনুসন্ধানে উঠে আসে, গত ৮ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক ১০টার দিকে কক্সবাজার জেলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল (আদালত-২) এবং জেলা ও দায়রা জজ আদালতের দেহরক্ষী হিসেবে কর্মরত কনস্টেবল মো. ইমতিয়াজ হোসেন কোনো ছুটি না নিয়ে কক্সবাজার থেকে ঢাকার উদ্দেশে দেশ ট্রাভেলসের একটি এসি বাসে রওনা দেন। বাসটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর ঢাকা মেট্রো-ব-১৫-১৬৪২, কোচ নম্বর-৩৭ এবং আসন নম্বর-ই-১।
পরে দিনগত রাত অর্থাৎ ৯ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক ১টা ২০ মিনিটের সময় ঢাকাগামী ওই বাসটি বাকলিয়া থানার নতুন ব্রিজ পুলিশ চেকপোস্টে পৌঁছালে তল্লাশি করা হয়। এ সময় বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহম্মেদ, এসআই মোহাম্মদ আল-আমিন সরকার, এসআই মোহাম্মদ আমির হোসেন ও এএসআই মো. সাদ্দাম হোসেন তল্লাশিতে অংশ নেন।
তল্লাশিকালে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) উপস্থিতির কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হলেও, ওই সময় তিনি ডবলমুরিং থানার নিজ বাসায় অবস্থান করছিলেন বলে দাবি করেন।
এ দাবির সমর্থনে তিনি ডবলমুরিং থানার প্রবেশপথ ও বাসার ভিডিও ফুটেজ এবং মোবাইল ফোনের লোকেশন সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে বলেও প্রতিবেদককে জানান।
তদন্তে জানা যায়, কক্সবাজার জেলা পুলিশের কনস্টেবল মো. ইমতিয়াজ হোসেন ৮ ডিসেম্বর রাতে ঢাকার উদ্দেশ্যে দেশ ট্রাভেলসের একটি এসি বাসে (কোচ নং-৩৯-কক্স-ঢাকা, রেজি. নং ঢাকা মেট্রো-ব ১৫-১৬৪২, সিট নম্বর ই-১) যাত্রী হিসেবে রওনা হন। তার সঙ্গে থাকা একটি ট্রলি ব্যাগ (যা বাসের সাইট বক্সে রাখা ছিল) সম্পর্কে পুলিশের পক্ষ থেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে তাকে বাস থেকে নামিয়ে পুলিশ বক্সে নিয়ে গিয়ে ট্রলি ব্যাগটি খোলা হয়।
তল্লাশিতে ব্যাগের ভেতরে আনুমানিক ১ লাখ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। তবে অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়েছে, বাকলিয়া থানায় কর্মরত সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসাররা উদ্ধারকৃত ইয়াবা আত্মসাৎ করেন এবং রাত আনুমানিক ৩টা ৩০ মিনিটে কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনকে থানা থেকে ছাড়েন।
তদন্তে আরও জানা যায়, কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনের সঙ্গে কক্সবাজার সদর থানার কলাতলী এলাকার কিছু স্থানীয় ব্যক্তির যোগাযোগ ছিল। এর মধ্যে একজনকে তিনি মোশারফ নামে চিনতেন। মোশারফ কনস্টেবলকে নগদ ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার বিনিময়ে ইয়াবার একটি চালান ঢাকার উদ্দেশ্যে বহনের প্রস্তাব দেন।
কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেন অবৈধ প্রস্তাবে রাজি হয়ে ইয়াবা ভর্তি লাগেজ গ্রহণ করেন এবং কোনো ছুটি না নিয়ে রাত ১০টা ১৫ মিনিটে কক্সবাজার থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন।
বাসটি কর্ণফুলী ব্রিজ পার হওয়ার পর রাত আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিটে নতুনব্রিজ পুলিশ চেকপোস্টে থামে। এ সময় এএসআই মো. সাদ্দাম হোসেন একজন সিভিল ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে বাসে ওঠেন এবং কনস্টেবল মো. ইমতিয়াজ হোসেনকে বাস থেকে নামিয়ে পুলিশ বক্সের ভেতরে নিয়ে যান। বাসের সুপারভাইজার মিজান পেছন থেকে তাদের অনুসরণ করলে এসআই মোহাম্মদ আমির হোসেন তাকে বক্স থেকে বের করে দেন।
পুলিশ বক্সে তখন বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদ টেবিলের সঙ্গে চেয়ারে বসা অবস্থায় ছিলেন এবং এসআই মো. আল আমিন সরকার দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর দুই পুলিশ সদস্য বাসের সুপারভাইজারকে নির্দেশ দেন, যাত্রীদের লাগেজ বের করতে।
সুপারভাইজার বাসের সাইট বক্স থেকে কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনের একটি কাঁধের ব্যাগ এবং একটি ট্রলি ব্যাগ তুলে দুই পুলিশ সদস্যের হাতে দেন।
পুলিশ বক্সের ভেতরে ট্রলি ব্যাগটি পুলিশের উপস্থিতিতে সিভিল চেকার টেবিলের ওপর রাখেন এবং খোলার চেষ্টা করেন। ঢাকনা সামান্য খোলার পর ভেতরে ইয়াবা দেখতে পেয়ে আবার ঢাকনা বন্ধ করেন।
কনস্টেবল মো. ইমতিয়াজ হোসেন বিপুল পরিমাণ ইয়াবার সঙ্গে ধরা পড়ায় উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের কাছে নিজেকে সেফ এক্সিট দেওয়ার জন্য অনুনয় করেন। এই সময় পুলিশ সদস্যরা নিজেদের মধ্যে গোপনে আলাপ-আলোচনা করেন।
পরে ট্রলি থেকে কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনের সামনে একে একে ৮টি ইয়াবার কার্টন বের করা হয়, প্রতিটি কার্টনে ১০ হাজার করে ইয়াবা ছিল। কনস্টেবল তার ভিডিও স্বীকারোক্তিতে দুই হাতের ইশারায় উদ্ধারকৃত ইয়াবার বক্সের আকারও দেখান। কিছুক্ষণ পর ট্রলি পুরোপুরি পুলিশ সদস্যদের হেফাজতে থাকে।
কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, আরও এক-দুইটি ইয়াবার কার্টনও ছিল। এরপর পুলিশ বক্সে থাকা পুলিশ সদস্যরা সব ইয়াবা নিজেদের দখলে রেখে শুধুমাত্র কাপড়চোপড়সহ লাগেজটি কনস্টেবলকে ফেরত দেন এবং তাকে চলে যেতে বলেন।
কনস্টেবল বাস থেকে বের হয়ে বাসটি সঠিকভাবে দেখেননি।
এ সময় এসআই মোহাম্মদ আমির হোসেন বাসের সুপারভাইজারকে নির্দেশ দেন, যাত্রীসহ বাসটি ঢাকার উদ্দেশ্যে চলে যেতে।
কনস্টেবল মো. ইমতিয়াজ হোসেন পুলিশের নির্দেশে বাসের সুপারভাইজারকে বলেন, ‘ওনার স্যার আসছেন, কোনো সমস্যা নেই, তোমরা চলে যাও।’ এ কথায় সুপারভাইজার কনস্টেবলকে পুলিশ বক্সে রেখে বাকি যাত্রীদের নিয়ে বাসটি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পরে কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেন সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে অলংকার মোড়ে পৌঁছে সেখানে বাসে চড়ে কুমিল্লার নিজ বাড়িতে ফিরে যান।
তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে, বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদ, এসআই মো. আল আমিন সরকার, এসআই মো. আমির হোসেন এবং এএসআই মো. সাদ্দাম হোসেন কমপক্ষে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ পিস ইয়াবাসহ ধরা পড়া কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনকে কোনোরূপ আইনানুগ ব্যবস্থা না নিয়ে ছাড়েন।
উদ্ধার করা ইয়াবা আত্মসাৎ করে নিজেদের দখলে রাখেন তারা।
এএসআই সাইফুল আলম, এএসআই মো. জিয়াউর রহমান, এএসআই মো. এনামুল হক, কনস্টেবল মো. রাশেদুল হাসান ভূঞা এবং নারী কনস্টেবল উম্মে হাবিবা স্বপ্না—এই অবৈধ কর্মকাণ্ডে সরাসরি সহযোগিতা করেছিলেন।
জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, বাকলিয়া থানার পুলিশ সদস্যরা ঘটনার বিষয়ে মিথ্যা তথ্য প্রদান করেন। তারা সবাই কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনকে গাড়ি থেকে নামানো, পুলিশ বক্সে নেওয়া এবং ইয়াবা উদ্ধার সংক্রান্ত দায়িত্ব অস্বীকার করেন।
এমনকি পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদ ও এসআই মো. আল আমিন সরকারও নিজেদের জবানবন্দিতে নতুনব্রিজ পুলিশ বক্সে উপস্থিত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেন।
পরে এটি কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনের স্বীকারোক্তি এবং এসআই মো. আমির হোসেন, এএসআই সাইফুল আলম ও নারী কনস্টেবল উম্মে হাবিবা স্বপ্নার জবানবন্দির মাধ্যমে প্রমাণিত হয়।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী একটি বিস্তারিত অনুসন্ধান প্রতিবেদন পাঠান।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাময়িক বরখাস্তকৃত পুলিশ সদস্যরা সব অবৈধ ও অন্যায় কর্মকাণ্ডে সরাসরি সহযোগিতা করেছেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে মিথ্যাচারসহ বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান করেছেন।
প্রতিবেদনে এসব অপরাধের জন্য বিভাগীয় সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
পাশাপাশি সাময়িক বরখাস্তকৃত পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকে জমাযোগ্য সরকারি মালামাল জমা নেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
